Bristiveja Gondho - A bengali story

Jolchobi

বৃষ্টিভেজা গন্ধ

আভাস চক্রবর্তী

(১)
আজ বিকেলের দিকে অফিসে একটু কাজের চাপ কম ছিল সুমিতের। নিজের কেবিনে চেয়ারে বসে কম্পিউটারে ডেটা গুলো চেক করছিল সুমিত। আগের মাসে কোম্পানি বেশ ভালই লাভ করেছে। টার্নওভার গ্রাফটা তাদের বেশ কয়েকমাস ধরেই উর্দ্ধমুখী। সুমিত বেশ হালকা মেজাজেই একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত গুনগুন করতে করতে সব চেক করছিল। এই তো নেক্সট মাসেই আবার একটা কোম্পানির সঙ্গে ওদের একটা বড়সড় ডিল হবার কথা আছে। সুমিত চেষ্টা করবে ডিলটা যাতে ওদের কোম্পানিই পায়। মার্কেটে ওদের রাইভ্যাল কোম্পানির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সবাই চেষ্টা করে অন্যের কাছ থেকে ডিল ছিনিয়ে নিতে। সুমিতের এসব এখনো বেশ অদ্ভুতই লাগে। সারাক্ষণ এখানে সবাই সবার পিছনে কাঠি করার চেষ্টা করছে।

দরজা খুলে সুমিতের বেয়ারা ঢুকল এক কাপ চা নিয়ে। সুমিতের পছন্দের দুটো বিস্কুট সহ চা দিয়ে আবার চলে গেল।

চায়ে চুমুক দিলেই সুমিতের মনটা বরাবরই হালকা হয়ে যায়। আজও হলো। চায়ে চুমুক দিয়ে সুমিত ভাবছিল পুরনো কথা। ফিজিক্স পড়তে পড়তে এসব বিজনেসের ইঁদুর দৌড়ে ঢুকে পড়বে কোনদিন ভেবেছিল ! দিব্যি ফিজিক্সে ডক্টরেট করে রিসার্চে ঢুকে পড়বে ভেবেছিল। কিন্তু যা ভেবেছিল তা আর হল কই !! সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে ফিজিক্সে বি.এসসি করে সুমিত ভাবছিল এম.এসসি করবে,এমন সময় কে যেন পরামর্শ দিল যে আর এম.এস.সি করার দরকার নেই, এম.বি.এ করে একটা চাকরিতে ঢুকে পড়লেই লাইফ সেট হয়ে গেল। সুমিত কোনদিন ভাবেনি যে ক্যাটে চান্স পেয়ে যাবে। শুধু বাবা-মার আবদারেই একটু প্রস্তুতি নিয়ে ক্যাট দিয়েছিল। রাজাবাজারে ফিজিক্সে এম.এস.সি তে চান্স পেলেও ওর আর এম.এস.সি পড়া হয়নি। দিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেন ট্রেড এ চান্স পেয়ে এম.বি.এ পড়তে চলে গিয়েছিল সুমিত।

সুমিত বসে বসে যখন এসব আকাশপাতাল ভাবছিল তখন হঠাৎ টেবিলের ওপর সুমিতের ফোনটা বেজে উঠল। সুমিত চিন্তা বন্ধ করে ধীরে সুস্থে ফোনটা ধরল। ফোনটা ধরে যা শুনল তাতে ওর মুখের প্রসন্নভাবটা আরো বেড়ে গেল। যাক সপ্তা দুয়েক পরেই কোম্পানি ওদের সঙ্গে মিটিংটা করে ফেলবে। তারপর ওরা ডিসাইড করবে যে ওদের সঙ্গে ডিল হবে কি হবে না !

সুমিত চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। চায়ের কাপটা ঠিক করে প্লেটে রাখল।

সুমিত হেঁটে ওর ঘরের জানলাটার কাছে গেল। এখান দিয়ে একটু দূরের একটা বস্তি পরিষ্কার দেখা যায়। প্রায় সবসময়েই অনেকগুলো লোক জড়ো হয়ে কিসব যেন করে আর খালি হাসাহাসি করে। সুমিতের মাঝেমধ্যেই ওদের মতো হতে ইচ্ছা করে। এসব সেজেগুজে অফিসে আসা,টাইম বেঁধে চলা এসব থাকবে না। দিব্বি ওইরকম বসে হাসাহাসি করবে। অন্তত একটা প্রাণোচ্ছলতার মধ্যে তো থাকবে। এখানে কাঁচের ঘরগুলোর মধ্যে সবাই যেন কেমন নিষ্প্রাণ,পুতুলের মতো। সবাই সবাইকে টপকে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সবসময় সবাই চেষ্টা করছে আরেকজনকে টপকানোর,কতৃপক্ষের কাছে আরেকজনের নাম খারাপ করার । সুমিতের প্রায়ই এগুলো ভাল লাগে না। একদম ভাল লাগে না। সুমিত তাকাল বস্তিটার দিকে। আজ একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। চারিদিকে ভেজা ভেজা একটা গন্ধ। সুমিত অবশ‍্য কাঁচের ঘরের ভেতর থেকে গন্ধ পায় না। গন্ধ তো পেত ছোটবেলায় কোন্নগরের বাড়িতে থাকার সময়। সুমিত আর ওর দিদি মিলে বৃষ্টিতে ভিজত আর মা ওদের ধরতে এলেই দুজনে মিলে ছোটাছুটি করত ছাদের এদিকে ওদিকে। মা ও ওদের ধরতে গিয়ে ভিজে যেতেন।
আজ বস্তিটার সামনে সেরকম কেউ নেই। শুধু একটা বাড়ির বারান্দায় তিনটে বাচ্চা ছেলে মেয়ে কাড়াকাড়ি করে ভাত খাচ্ছে। সুমিতের মুখে একটু হাসি খেলে গেল। কি মজা এরকম খাবার ভাগ করে খাওয়ায় !!

এম.বি.এ পড়ার সময় কৌশিকী যখন দিল্লির বস্তিতে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েকে খাওয়াতো তখন সেখানেও বাচ্চাগুলো এভাবেই কাড়াকাড়ি করে খেত না ! সুমিত আর কৌশিকী ওদের কাড়াকাড়ি দেখে প্রথম প্রথম থামানোর চেষ্টা করত। তার কয়েকদিন পর না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। দুজনেই বুঝে গেছিল যে এতেই ওদের আনন্দ। আনন্দটা এভাবেই ওরা ভাগ করে নেয় ! তারপর থেকে ওরা কাড়াকাড়ি করে খাবার খাওয়া শুরু করতেই কৌশিকী আর সুমিত দুজনেই হাসত। মাসে এই দুটো দিন ওখানে যাওয়ার জন‍্য কৌশিকী একেবারে মুখিয়ে থাকত। সুমিত প্রথম প্রথম শুধুই খাবারের প‍্যাকগুলো বয়ে দেওয়ার জন‍্য যেত। তারপর থেকে ওই কচি কচি মুখগুলোর নির্মল হাসিগুলো ওকে খুব টানত। সুমিত সেই আনন্দটা পেয়ে গেছিল যে আনন্দটা পেতে কৌশিকী বারবার ছুটে যেত ওদের কাছে। সুমিত হঠাৎ ভাবুক হয়ে গেল !! কে জানে কৌশিকী এখন কোথায় আছে , কি করছে !!

সুমিত জানলার সামনে দাঁড়িয়ে তাকাল ওর টেবিলটার দিকে। এখানে কৌশিকীর দেওয়া একটা পেন রাখা আছে।
রেজাল্ট আউটের পর যখন ইনস্টিটিউটের সবাই মিলে ছবি তোলা হচ্ছিল তখন সুমিতকে কৌশিকী একটা পেন দিয়ে বলেছিল,'এই পেনটা দিয়ে সব বড়বড় পেপারে সাইন করবি কিন্তু।' সুমিত হেসেছিল তারপর সুমিতও একটা সুন্দর দামী পার্কার পেন দিয়েছিল কৌশিকীকে। দিয়ে বলেছিল,'এটা দিয়ে তুইও লিখিস কিন্তু।' কৌশিকী পেনটা দেখে একটু চমকে উঠে মনখারাপ করে বলেছিল,'এত দামী পেন দিলি কেন ! দেখ আমি কিন্তু এত দামী পেন দিতে পারিনি। ওটা তুই রাখবি তো ?'
সুমিত হেসে টেনে গিয়েছিল কৌশিকীকে পিছনের ক‍্যাম্পাসে। কৌশিকীর হাতটা নিজের হাতে টেনে নিয়ে একটা চুমু দিয়েছিল। তারপর কৌশিকীর কানে কানে প্রায় ফিসফিস করে বলেছিল ,'এটার দাম আমার কাছে অনেক বেশী । তুমি যে হৃদয় দিয়ে ওই বাচ্চাগুলোকে ভালোবাসো ঠিক সেই হৃদয়টা ছুয়েই এই উপহারটা আমার কাছে এসেছে। এটার দাম আমার দেওয়া ওই পার্কার পেনের থেকে অনেক বেশী গো। এটা অমূল‍্য কারণ ভালোবাসাকে কোন মূল‍্য দিয়ে মাপা যায় না। '
কৌশিকীও প্রায় ফিসফিস করে বলেছিল ,'এই জন‍্যই এত ভালোবাসি। কথা দাও আমায় ছেড়ে কোনদিন কোথাও যাবে না। '
সুমিত কৌশিকীর দুটো হাত ওর নিজের দুটো হাতে নিয়ে বলেছিল,'কথা দিলাম পাশে থাকব।'
তারপর দুজনেই আবার সামনের দিকে সবার সামনে চলে এসেছিল। অন‍্যদের সামনে ওরা দুজনেই দুজনকে 'তুইতোকারি' করেই কথা বলত কারণ ওদের বন্ধুরা অবাঙালি হলেও বাংলা বেশ ভালোই বুঝত তাই ওরা কাউকে বুঝতে দিতে চাইত না যে দুজনে দুজনকে ভালোবাসে। যদিও ওদের বন্ধুরা অল্পস্বল্প সন্দেহ করত কিছু একটা।

'স‍্যার,বাড়ি যাবেন না ?'
বেয়ারার ডাকে সুমিত চমকে উঠল। একটু ধাতস্থ হয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল সুমিত। দেখল ছটার বেশি বেজে গেছে। বেয়ারাকে বলল,'তুমি যাও,আমি আসছি।'
সুমিত ওর পিসিটা অফ করে বেরিয়ে এল কেবিন থেকে। অনেকেই তখন বেরিয়ে গেছে অফিস থেকে,বাকিরাও বেরোবে বেরোবে করছে। সুমিত অফিসের পার্কিং লটে নেমে এল। সুমিত ওর গাড়িটার সামনে গেল। টয়োটা ফরচুনার। বেশ দামী মডেল। আগের মাসেই কোম্পানি থেকে গাড়িটা পেয়েছে সুমিত। বেশ দারুন চলে। সুমিত গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল। এসিটা হাল্কা করে চালিয়ে দিল সুমিত। সুমিত বাড়ির দিকে যেতে যেতে ভাবছিল সত‍্যি !! সময় কত বদলে যায়। তাই না ? কোথা থেকে কি হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। স্বয়ং ঈশ্বরও বোধহয় পারেন না।

ওর থ্রি বিএইসকে ফ্ল‍্যাটটায় ঢুকল সুমিত।কালই সুমিতের দিদিরা চলে গেছে। আজ একদম খা খা করছে ফ্ল‍্যাটটা।
সুমিত গিয়ে ওর স্টাডিতে ঢুকে তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে পুরনো একটা ফাইল বের করল। অনেক বছর আগেকার। সুমিত তখন এম.বি.এ পড়ছে। সবার একটা গ্রুপ ফোটো আছে ফাইলে। ওটাই বার করল ও। সুমিত আর কৌশিকী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ফোটোতে। কতদিন আগের ছবি ! সুমিত তখন খুব রোগা। ঢোলা একটা জামা পরা। কৌশিকী বরাবরই একটু স্বাস্থ‍্যভালো গোছের। হাসছে দুজনেই ! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমিত ফোটোটা আবার ঢুকিয়ে রাখল। রাতে আর বেশি কিছু খেল না সুমিত। এক কাপ কফি আর কয়েকটা বিস্কুট খেয়ে শুয়ে পড়ল।

(২)

পরদিন অফিসে আবার কাজের চাপে সুমিত কৌশিকীর কথা ভুলে গেল। এবার পরপর বেশ কয়েকদিন কাজের চাপে সুমিত আর দম ফেলার সময় পেল না। কাজের চাপের মধ‍্যে দিয়ে কি করে একটা সপ্তাহ কেটে গেল সুমিত টেরই পেল না। পরের সপ্তাহ এসে গেল।

সেই কোম্পানির সঙ্গে মিটিং এর ডেট ফিক্সড হয়ে গেল। মিটিং এ সুমিত আর ওদের দুজন জুনিয়ার এক্সিকিউটিভ ওই কোম্পানির কয়েকজনের সঙ্গে মিটিং করবে। সুমিত প্রস্তুতিতে কোন ফাঁক রাখল না,যে করে হোক এই ডিলটা ওকে ক্র‍্যাক করতেই হবে। মিটিং এর আগের দিন সুমিত ওর দুজন জুনিয়রকে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিল।সেদিন সন্ধ‍্যার একটু পরে একটা ফোন এল,অচেনা নম্বর। সুমিত একটু কিন্তু কিন্তু করেই ফোনটা তুলল।

'হ‍্যাঁলো'।
'হ‍্যাঁলো...সুমিত মৈত্র ? 'এস এন্ড ডি কোম্পানির সিনিয়র মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ কৌশিকী দত্ত স্পিকিং'

কৌশিকী !! সেই সুরেলা গলা ! এই গলায় কত রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছে সুমিত ! সেই হ‍্যাঁলো বলার পর একটুখানি থেমে সুমিত বলা। সব একদম একই আছে ! সেই আগের মতোই।

কিন্তু এটা পেশাদারিত্বের জগৎ। আবেগ,নিজের ব‍্যক্তিগত চাওয়াপাওয়াকে লুকিয়ে রাখার জায়গা।
সুমিত গলাটা যথাসম্ভব নিরুত্ত্বাপ রেখে বলল,'ইয়েস,প্লিজ প্রসিড।'
'কালকের মিটিংটা অ্যাটেন্ড করছেন তো স‍্যার ?'
'সার্টেনলি ম‍্যাম। এনিথিং রং ?'
'নো,নো। ইটস অল রাইট'।
'থ‍্যাঙ্ক ইউ ম‍্যাম।'
'ওকে,থ‍্যাঙ্কস। গুড নাইট'

ফোনটা রাখল সুমিত। একটুক্ষণ থ হয়ে বসেছিল সুমিত। কৌশিকীই তাহলে ওই কোম্পানি থেকে আসছে মিটিং এ। অবশ‍্য কৌশিকী যেরকম স্টুডেন্ট ছিল তাতে এরকম একটা পজিশনে পৌছানোই ওর পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু এভাবে দেখা হবে সুমিত কোনদিন ভাবেনি। ইনস্টিটিউট থেকে বেরোনোর পর অনেক চেষ্টা করেও কৌশিকীর কোন খোঁজ পায়নি সুমিত। একেবারে ভোজবাজির মতই কৌশিকী হারিয়ে গেছিল ওর জীবন থেকে। কত অপেক্ষা করেছে সুমিত। কৌশিকীর বারাসাতের বাড়ি গিয়ে শুনেছে ওরা আর ওখানে থাকে না , অন‍্যকোথাও একটা চলে গেছে। সেই কৌশিকীর সঙ্গে কতদিন পর দেখা হবে আবার !! কি লাভ আর দেখা হয়ে এত বছর পর ! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমিত আবার কাজে মন দিল।

ফোনটা অফ করে কৌশিকীও চুপ করে বসেছিল। কতদিন পর সুমিতের সঙ্গে কথা বলল। কথা বলার জন‍্যই তো ফোন নম্বরটা নিয়েছিল নইলে দরকারী কথা তো সব ওর জুনিয়র অফিসাররাই বলে নিয়েছে।গলার আওয়াজটা একই আছে প্রায়। আগের মতোই সেই রোগা আছে নাকি নাকি মোটা হয়ে গেছে !
কৌশিকী নিজের অজান্তেই ওর ডান গালে থুতনির কাছটায় একটা হাত দিল !

সেবার ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে মানালি ঘুরতে গেছিল। বেশ ঠান্ডা পড়েছিল সেবার। সুন্দর এক শীতের ভোরে কৌশিকী গেস্ট হাউজের সামনে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা মাখতে মাখতে মানালির সৌন্দর্য উপভোগ করছিল আর শীতে কাপছিল। সুমিত ও সেদিন বেশ সকাল সকাল উঠে পড়েছিল। কৌশিকীকে ঠান্ডায় কাপতে দেখে একটা শাল এনে জড়িয়ে দিয়েছিল কৌশিকীর গায়ে আর কৌশিকীকে নিজের গরম জ‍্যাকেটের গায়ে টেনে নিয়েছিল। সুমিতের গরম ওম নিতে নিতে একটু স্বস্তি পেয়ে কৌশিকী সুমিতের মুখের দিকে একবার মুখ তুলে তাকাল। সুমিত কৌশিকীর মুখের দিকে একটু ঝুকে ওর ডান গালটায় থুতনির কাছে সুন্দর করে একটা আলতো চুমু খেল। কৌশিকীর সারা গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। সুখের একটা আবেশে চোখ বুজে এল ওর।মনটা ভীষণ ভালো হয়ে গেল। সব ঠান্ডা যেন কোথায় চলে গেল মুহূর্তের মধ‍্যে। পরমুহূর্তেই কৌশিকীর সুন্দর ফর্সা গালদুটো লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সুমিতের কাছ থেকে দৌড়ে পালাল কৌশিকী। লজ্জায় সুমিতের সঙ্গে সেদিন আর মুখ তুলে কথাই বলেনি কৌশিকী।

কৌশিকী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর অনেক কাজ পড়ে আছে সেসব করতে হবে। খাটে শুয়ে থাকা বছর সাতেকের সুমনের দিকে তাকাল কৌশিকী। জ্বরটা এখন একটু কম সুমনের। ওষুধ গুলো ঠিকঠাক খাওয়াতে হবে । উঠে পড়ল কৌশিকী।

(৩)

সুমিত অফিসে আজ একটু তাড়াতাড়িই ঢুকল। মিটিংটা আজ সাকসেসফুল করতেই হবে। সুমিত অফিসে ঢুকে দেখল ওর জুনিয়ররা রেডি হয়ে গেছে। যদিও মিটিং এখনো অনেক পরে। সুমিত ওর জুনিয়রদের সঙ্গে একটু আলোচনা করে নিচ্ছিল মিটিং এর ব‍্যাপারগুলো। আলোচনা শেষ করে সুমিত একটু বেরোল ওর কেবিনের করিডরটার সামনে। এমন সময় দেখলো দূরে অফিসে কৌশিকী ঢুকছে।
কৌশিকীকে দেখছে সুমিত। চেহারাটা সেই আগের মতই মিষ্টি আছে। আগের থেকে একটু মুটিয়ে গেছে। মুখটা বেশ হাসি-হাসি। বিয়ে করে বোধহয় বেশ ভালোই আছে। চেহারাটা বেশ ঝকঝকে হয়েছে। চোখেমুখে একটা ব‍্যক্তিত্ত্ব ঝলমল করছে। নাহলে সেই আগের মতই আছে কৌশিকী। ৪৪ এ দাঁড়িয়ে সুমিতের মনে হল সেই বছর ১৯ আগের কৌশিকীকেই দেখছে।

হঠাৎ করে সুমিতের কৌশিকীর সাথে দেখা হওয়ার সেই প্রথম দিন মনে পড়ে গেল।

দিল্লিতে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এল সুমিত। এর আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে এসেছিল ঘুরতে। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেন ট্রেড এর একতলায় সুমিত একা। কোথায় কি যেতে হবে সুমিত কিছুই বুঝতে পারছিল না। এমন সময় দেখল ওর দিকেই একটা মোটাসোটা মিষ্টি চেহারার মেয়ে আসছে। মেয়েটাও কেমন যেন একটা ইতস্তত ভাবে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সুমিতের সামনে এসে মেয়েটা পুরোপুরি বাঙালি উচ্চারণে জিজ্ঞাসা করল ,'অ্যাডমিশন রুম কৌনসা ?'
সুমিত অবাক হয়ে হা হয়ে যেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। চওড়াভাবে হাসল সুমিত। বলল,'আপনি বাঙালি ?'
মেয়েটি চমকে উঠল। তারপর হেসে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,'যাক,আপনি বাঙালি। আমি একদম ভালো হিন্দি বলতে পারি না। '
সুমিতও সম্মতির হাসি দিল। লক্ষ‍্য করল মেয়েটিকে হাসলে খুব মিষ্টি লাগে।
সুমিত বলল,'আমি এম.বি.এ ফার্স্ট ইয়ার। অ্যাডমিশন রুম খুঁজছি।আপনি ?'
মেয়েটাও মাথা নেড়ে বলল,'আমিও। চলুন। খুঁজে বার করি। '
কথায় কথায় সুমিত জানতে পারল মেয়েটার নাম কৌশিকী দত্ত। বেথুন থেকে ম‍্যাথে অনার্স পড়ে এম.বি.এ পড়তে এসেছে।

খুব তাড়াতাড়িই সুমিত আর কৌশিকী বন্ধু হয়ে গেছিল। দুজনে দুজনকে ছাড়া একদম থাকতে পারত না। সেই বন্ধুত্ব যে কবে বন্ধুত্বের থেকে আরো কয়েক পা হেঁটে প্রেমে পরিণত হয়েছিল তা ওরা নিজেরাই জানত না। আন্দাজ পেয়েছিল কৌশিকী শুধু একবার। বন্ধুদের সাথে মানালি ঘুরতে গিয়ে। সুমিত সুন্দর এক শীতের সকালে কৌশিকীকে একটা মিষ্টি চুমু খেয়েছিল। কৌশিকী সেদিন বুঝেছিল শীতের স্বাদও মিষ্টি হয়।
কৌশিকী ফুচকা খেতে খুব ভালোবাসত। সুমিতের কাজ ছিল ঘুরে ঘুরে দিল্লির কোথায় ভাল ফুচকা পাওয়া যায় তার খবর রাখা‌। প্রায় শনিবারেই কৌশিকীর আবদারে সুমিতকেও ফুচকা খেতে হত।
সুমিত বুঝতে পারত না যে কৌশিকীকে ভালবাসতে গিয়ে ও ফুচকাকেও ভালোবেসে ফেলছে। কোথা দিয়ে তিনবছর এরকম মজা করে কেটে গেছিল সুমিত আর কৌশিকী বুঝতেই পারেনি কোনদিন। কনভোকেশনের দিনও সুমিত আর কৌশিকী হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিল সারাজীবন পাশে থাকার।
কিন্তু তালটা কেটে গিয়ে কি করে তা বেসুরো হয়ে গেল সুমিত আজও তার হিসেব পায়নি।

ঘড়ি দেখল সুমিত। এবার ওর যেতেই হবে। মিটিং এর সময় প্রায় হয়ে গেল।

মিটিং এ ঢুকল কৌশিকী। সুমিত বসে আছে ওদিকে। সেই উনিশ বছর পর দেখছে সুমিতকে !! চেহারা বিশেষ পাল্টায়নি সুমিতের। সেই গোঁফটা আগের মতোই আছে। চশমা হয়েছে একটা। চশমা অবশ‍্য কৌশিকীরও এখন হয়েছে। পরিবর্তন একটাই চোখে পড়ছে। আগের সেই রোগা সুমিত আর নেই। চেহারাটা বেশ মুটিয়ে গেছে। চোখে সেই দুষ্টু দুষ্টু ভাবটা আরো বেড়েছে। শুধু পেটের মাঝখানে বিশ্রী ভুঁড়িটার জন‍্য বেঢপ লাগছে সুমিতকে। অবশ‍্য কৌশিকীও কি কম মোটা হয়েছে নাকি !! অফিসে ওকে অনেকেই আড়ালে হাতি বলে ডাকে জানে কৌশিকী‌। নিজের কথা মনে পড়তেই হাসল কৌশিকী।

মিটিং শেষ হল। ডিলটা ফাইনাল হয়ে গেছে। সুমিত বেরিয়ে এল আগে। কৌশিকীর বাচনভঙ্গিতে মুগ্ধ । কৌশিকী এত সুন্দর করে মিটিং অ্যাটেন্ড করবে ভাবতে পারেনি সুমিত।

মিটিং শেষ করে সুমিতের অফিসে বসে কফি খেতে খেতে ভাবছিল কৌশিকী। সুমিত সেই আগের মতোই আগে সুপার কুল আছে। কিছুতেই মাথা গরম হয় না ! কত ঠান্ডা মাথায় অনর্গল বকে গেল। সুমিতকে আজ কি হ‍্যান্ডসাম লাগছিল না ! ধুস ! কি সব উল্টোপাল্টা ভাবছে ও। ৪৪ এ পৌছে এরকম ভাবনা ওর মানায় না। নিজের মনকে শাসন করল কৌশিকী। ওর এখন বাড়ি যেতে হবে ! সুমনের জ্বরের কি অবস্থা দেখতে হবে !
প্লাস্টিকের কাপটা ফেলে উঠে পড়ল কৌশিকী।

ওয়াশরুমে আয়নার সামনে নিজেকে একবার দেখল সুমিত। কৌশিকী কি চিনতে পারল না ! নাকি মোটা হয়ে গিয়ে আগের থেকে অনেক বিশ্রী দেখতে হয়ে গেছে। যাকগে ! ওসব ভেবে আর কি হবে ! সেই দিন কি আর আছে ! কৌশিকী তো বিবাহিত ! এরকম পজিশনে থাকা কেউ কি আর আনম‍্যারেড থাকে একটা কমবয়সের ইটিরপিটির প্রেমিকের কথা ভেবে ! নিজের মনকে প্রবোধ দিল সুমিত।

বিল্ডিং থেকে বেরোল সুমিত। দেখে সামনেই কৌশিকী গাড়িতে উঠবে। ওর উর্দিপরা ড্রাইভার গেট খুলে দিয়েছে। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল সুমিত গাড়িটার দিকে। 'কৌশিকী' বলে ডাকতে গিয়েও সুমিত থমকে গেল। কি হবে আর ডেকে ! কতকাল পার হয়ে গেছে ! সেই দিন কি আর আছে ওদের কারোরই ?
সুমিত দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎ কৌশিকী পিছনে ফিরে তাকাল। তাকিয়েই সুমিতকে দেখতে পেল ! দেখে একটুখানি হাসল ! সেই প্রথমদিনের মতই মিষ্টি লাগছে ! গালে একটা টোল পড়ল আগের মতো। গাড়িতে উঠতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল কৌশিকী। সুমিতও হাসল , কষ্টটা চেপে রেখে।
কৌশিকী দাঁড়িয়ে আছে। সুমিত কিছু বলার না পেয়ে বলল,'কেমন আছো ?'
কৌশিকী হাসল। কিছু বলল না।
এমন সময় হঠাৎ হালকা বৃষ্টি পড়া শুরু হল। সুমিত ভিজছে। কৌশিকীও ভিজছে। সুমিত ভেবেছিল কৌশিকী বৃষ্টি দেখে গাড়িতে উঠে চলে যাবে কিন্তু না। কৌশিকী যেন সুমিতের বলার জন‍্যই অপেক্ষা করছে বৃষ্টিতে ভিজে। কৌশিকীর বিজনেস স‍্যুটটা ভিজছে। সুমিতের কোটটাও ভিজে গেছে। সুমিতের চশমাটা ঝাপসা হয়ে গেছে। সুমিত এগিয়ে গেল কৌশিকীর কাছে। বলল ,'আমার সাথে যাবে একটু ? সেই আগের মতো ? '
কৌশিকী আবার হাসল। সম্মতির হাসি। ওর ড্রাইভারকে কি একটা বলতেই ড্রাইভার মাথা নেড়ে গাড়িতে উঠে বসল।
কৌশিকী সুমিতের দিকে এগিয়ে এল। সুমিতও এগিয়ে গিয়ে ওর দুধসাদা ফ‍রচুনার গাড়ির দরজা খুলল।

সুমিত গাড়ি চালাচ্ছিল আর মাঝেমধ‍্যে কৌশিকীর দিকে তাকাচ্ছিল। দেখছিল মানে খুঁজছিল কৌশিকীর মাথার সিঁদুরটা যদি কোনভাবে দেখা যায়। কিন্তু কই ! দেখতে পাচ্ছে না তো ! অবশ‍্য আজকালকার মহিলারা তো কেউই শাঁখা সিদূর কিছুই পরে না। আর এরকম পজিশনের কর্পোরেট টাইকুন কেন পরবে ! নিশ্চয়ই কৌশিকীর হাজবেন্ডও খুব দারুন কোন পজিশনে আছে ! আপনমনে সুমিত এক্সেলারেটরে চাপ দিল।

অন্দরে মৃদু স্বরে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছিল ,'আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ'। কৌশিকী গাণের তালে মাথা দোলাচ্ছিল। কৌশিকী এবার সুমিতকে বলল,'রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনো তাহলে এখনো ?'
সুমিত বলতে যাচ্ছিল সেই তুমি শোনা অভ‍্যাস করিয়েছিলে আর শোনা বন্ধ করিনি। কিন্তু কিছু বলল না। ঘাড় নাড়ল।
সত‍্যিই তো রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলেই তো ওর মনে হয় কৌশিকী ওর সঙ্গে আছে।
কৌশিকী উৎসাহিত হয়ে বলল,'এই তোমার মনে আছে কলেজ ফাংশনে এই গানটা আমি করেছিলাম ?'
সুমিতও উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল ,'হ‍্যাঁ,হ‍্যাঁ,। মনে আছে তো। দারুন হয়েছিল। '
কৌশিকী বলল,'কত রবীন্দ্রসঙ্গীত করতাম । এখন আর কিছুই করা হয় না ব‍্যস্ততায়। ভুলেই যাচ্ছি প্রায়।'
সুমিত ভাবল গান ছাড়া কৌশিকী। ও তো ভাবতেই পারে না !
বৃষ্টিটা থেমে গেছে। সুমিত গাড়ির ওয়াইপারদুটো বন্ধ করে দিল।
কৌশিকী লক্ষ‍্য করল। বলল,'এই বয়সেও নিজে গাড়ি চালাও ! ড্রাইভার রাখোনি ! কখন কি হয় !'
সুমিত হাসল। বলল,'নাহহ,কিচ্ছু হবে না। '
কৌশিকী কিছু বলার আগেই ওর ফোনটা বেজে উঠল। একটু কথা বলে আবার ফোনটা রেখে দিল কৌশিকী। সুমিত ততক্ষণে কৌশিকীর ফোনের স্ক্রিণে বাচ্চা ছেলেটার ছবি দেখে ফেলেছে। কৌশিকী তাহলে বিবাহিত ! একটা ছেলেও আছে ওর ! এরকম টাই তো ভেবেছিল সুমিত ! স্বাভাবিক ! একটা কি যেন চেপে রেখে গাড়ি চালাতে লাগল সুমিত।
কৌশিকীকে বলল,'কৌশিকী,এই যে তুমি চলে এলে তোমার হাজবেন্ড কিছু বলবে না দেরি দেখে ?'
কৌশিকী হাসল। বলল,'না।'
ব‍্যস্ত মানুষ তিনি ! কৌশিকীর দিকে সবসময় অত নজর দেওয়ার সময় নেই তার ! ভাবল সুমিত।

সুমিত হঠাৎ গাড়িটা থামাল। কৌশিকীকে নামতে বলে নিজেও নেমে পড়ল। কৌশিকী নামতেই বলল,'এখানে একটা ঝিল আছে ! যাবে নাকি ?'
'চলো'- বলল কৌশিকী।
একটু আগেই বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই জায়গাটা বেশ ফাঁকা। অন‍্যদিন নাহলে এইসময় কিছু লোকজন থাকে।
ঝিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ওরা দুজনে। ঝিলটার জল এখন খুব শান্ত। একটুও হাওয়া নেই যে। চারিদিকে একটা সুন্দর বৃষ্টি ভেজা সোঁদা সোঁদা গন্ধ। দিল্লিতে বৃষ্টির পরেও ক‍্যাম্পাস থেকে বেরোনোর সময় এই গন্ধটা ওরা পেতো। গন্ধটা এখনো নাকে লেগে আছে সুমিতের।
কৌশিকীরও মনে আছে সেই গন্ধটা। একটু উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল,'সেই বৃষ্টির গন্ধটা না ?'
সুমিতও উৎসাহিত হয়ে বলল,'হ‍্যাঁ। মনে আছে দেখছি তোমারও। একদম সেই গন্ধটা। '
দুজনে কিছুক্ষণ প্রাণভরে সেই গন্ধটা শুকল। সুমিত তো বুকভরে সোঁদা গন্ধ ভরে নিল।
সুমিত ঝিলের সামনে মাটিতে ঘাসের উপর কোট প‍্যান্ট পরেই বসে পড়ল। ওর দেখাদেখি কৌশিকীও ওর পাশেই বসে পড়ল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ।
সুমিত চটকা ভেঙে কথা বলল প্রথম।

'সেই বস্তি বস্তি যাও এখনো বাচ্চাদের খাওয়াতে ?'
'যাই। আর একটা জিনিসও করেছি । '
'কি জিনিস ?'
'একটি এনজিও আছে আমার। এই সব বস্তির ছেলেমেয়েদের দরকারি সব চাহিদা পূরণ করে। "দিশা" নাম।'

চমকাল সুমিত ।
'"দিশা" তোমার এনজিও' ?
'হ‍্যা ,কেন ?'
'আমি বছর চারেক ধরে ওদেরকে মাসে মোটামুটি হাজার আশি করে দি।'

এবার কৌশিকীর চমকাবার পালা ।
'ওই ভদ্রলোক তুমি ?'
'হুম । '
'জানতামই না একদম ! জানো তোমার জন‍্যই আমাদের এনজিওর কত উপকার হয়। কত বাচ্চা পেট ভরে খেতে পারে। কত দরকারি জিনিস পায় । '
'ও। আচ্ছা। শুনে খুব খুশি হলাম । '
সুমিত মনে মনে ভাবল আলাদা হয়ে গেলেও আমরা মনের দিক থেকে কতটা এক দেখলে তো ।
মুখে কিছু বলল না সুমিত । কৌশিকীর মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল ।

কৌশিকীও হাসছিল । বলল,'বিয়ে করেছো ,ছেলেমেয়ে কটা ?'
সুমিত হাসল । ঘাড় নেড়ে বলল,'না। বিয়ে করিনি।'
কৌশিকী বলল ,'কেন ? একা একা থাকতে পারো ? ভালো লাগে ?'
সুমিতের মনে হল কেউ ওর বুকে চাপা পাথরটার উপর আরো একটা পাথর চাপা দিয়ে দিচ্ছে ।
সুমিত ফ‍্যাকাশে হাসল । বলল,'হ‍্যাঁ,এই তো বেশ আছি।'
দুজনেই বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ । সামনের ঝিলে একটা মাছরাঙা পাখি ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিয়ে গেল।
সুমিত আস্তে করে জিজ্ঞাসা করল ,'সেদিনের পর তোমায় অনেক খুঁজেছিলাম জানো ?'
কৌশিকীও মাথা নামাল। সম্মতি জানিয়ে ঘাড় নাড়াল। বলল,'কিছু করার ছিল না। '
সুমিত বছর পাঁচেক আগে কথাটা শুনলেও উত্তেজিত হয়ে পড়ত। আজ হলো না। বলল,'কেন ?'
'আমার এমবিএ পড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে বাবা প্রায় ফতুর হয়ে গিয়েছিলেন। ওই অবস্থায় আমার একটা চাকরি পাওয়া খুব দরকারি ছিল। বাবা চেয়েছিলেন আমি যেন প্রতিষ্ঠিত হই । '
সুমিত কৌশিকীর দিকে তাকাল। এত স্থির মেয়েটা ! এত কঠিন !
আস্তে করে জিজ্ঞেস করল ,'কাকু এখন কেমন আছেন ?'
কৌশিকীর মুখটা বিষণ্ণ হয়ে এল একটু ।
বলল,'বাবা বছর সাতেক হলো চলে গেছেন । '
সুমিতেরও একটু মনটা খারাপ হয়ে গেল । বেশ দিলদরিয়া ছিলেন ভদ্রলোক। একবার দিল্লিতেই আলাপ হয়েছিল ।
সুমিত কৌশিকীকে একটু সান্তনা দিয়ে বলল,'কেউ চিরকাল থাকেন না। আর কাকু তো তোমাকে সুপ্রতিষ্ঠিত দেখেই গেছেন। তার মনের ইচ্ছা তো পূরণ হয়েইছে। '

কৌশিকী এবার একটু কষ্ট করে হাসল। বলল ,'বাদ দাও । যত মনে পড়ে তত কষ্ট হয়। '
সুমিত বলল,'তা ঠিক। '
কৌশিকী এবার সুমিতকে বলল,'বিয়ে করোনি ! খুব মজাতেই তো আছে। আমার মত কত মহিলাকে লিফট দাও শুনি ? ভালই চালাচ্ছো ইন্টুমিন্টু। '
কৌশিকী এমন করে বলল যে সুমিত না হেসে পারল না।
হ‍্যাঁ,বিজনেসের স্বার্থে বহু সুন্দরী মহিলার সাথে পার্টিতে কমবেশি কোমর দুলিয়েছে বটে তবে তার বেশি কিছু হয়নি কখনো !
সুমিত হাসতে হাসতেই বলল,'না,না‌‌। লিফট শুধু তোমার জন‍্য। '
কৌশিকীও হাসতে হাসতেই বলল ,'যাক। শুনে খুশি হলাম। '
সুমিত বলল,'তোমার ছেলেটা কিন্তু বেশ মিষ্টি । দৃষ্টিটা বেশ ডীপ । '
কৌশিকী বলল ,'সুমিত ,তুমি একটা গাঁধা । '
সুমিত ভড়কে গেল । বলল,'কেন ?'
'তুমি আমার জন‍্য সারা জীবন বিয়ে না করে কাটিয়ে দিলে আর আমি বিয়ে করে ফেলব ! আমার ওপর তোমার এই বিশ্বাস ?'
সুমিত কিছুই বুঝতে না পেরে আমতা আমতা করছিল।
কৌশিকী এক ধমক দিয়ে বলল,'বোকুরাম ! শোনো । ওটা একটা বাচ্চা। তবে আমার ছেলের মত। ও আমার সাথেই থাকে। ওর দুমাস বয়সে কে যেন ওকে আমার বাড়ির সামনে ফেলে গেছিল। ওর নাম 'সায়ন' । বুঝলে ? '
সুমিত তাও আমতা আমতা করছিল ।
কৌশিকী ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,'আমি তখন তোমায় ইচ্ছা করে বলিনি যে আমি।বিয়ে করিনি। দেখছিলাম মজাটা। বোকা। একদম বোকা । '
সুমিত এতটাই ভড়কে গেছে যে ওর মুখ দিয়ে এখনো কথা বেরোচ্ছে না ।
কৌশিকী সুমিতের নাকটা টিপে দিয়ে বলল,'আহা রে ! কি বোকা বনে গেছে লোকটা ! এই তুমি কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো। সায়নের জ্বর কমেছে। কিন্তু ওকে ওষুধ খাওয়াতে হবে ! আমায় ফিরতে হবে। সারা বিকাল ঝিলের পাশে বসে হাহা করলে চলবে না।'
সুমিত এতক্ষণে একটু একটু বুঝছে ব‍্যাপারটা । এবার বলল,'বাঁচালে। '
'কেন এতদিন মরা ছিলে ?'
'বেঁচে মরে ছিলাম।'
'আহা। ভালোবাসার ছিরি। একজনকে পাগলের মত ভালোবেসে তার ভালোবাসা না বুঝে ভবেশ হয়ে বসে রয়েছে। '
'কৌশিকী। তুমি কি আমার হবে ?'
'তোমার হয়ে আছি বলেই তো এতদিন ঝুলে আছি। '

সুমিত এতক্ষণে ওর স্বভাবসিদ্ধ ভাবটা খুঁজে পেয়েছে । হেসে বলল,'তুমি আমার মিষ্টি বৌ হবে কৌশিকী ? আমার ঘরে আসবে ?'
কৌশিকী এবার একটু লজ্জা পেল । পরমুহূর্তেই চোখ নাচিয়ে বলল,'এরকম একটা ছোট হাতি বিয়ে করলে লোকে কি বলবে ? তোমার হাতি পছন্দ হল শেষে ?'
সুমিত কৌশিকীর হাতটা ধরে জোর টেনে নিজের একদম কাছে নিয়ে এল। বলল,'উফ ! কি ভারি ! তবে আমার হাতিই পছন্দ । আর আমি নিজেই তো জলহস্তী ! আমার ভুঁড়িটা দেখেছো তো !'
কৌশিকী এবার ওর আঙুল দিয়ে সুমিতের পেটে একটা খোঁচা দিয়ে বলল,'দেখেছি জলহস্তীকুমার।'
সুমিতও কৌশিকীর ভুঁড়িতে পাল্টা একটা খোঁচা দিয়ে বলল ,'দেখো মজা ! লাগে না আমার।'
কৌশিকী বলল,'তাহলে এবার তোমার একটা হিল্লে হলো ! পরাধীন হলে আমার কাছে !'
সুমিত মুখে একটা ছদ্ম চিন্তিত ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,'হুম। বড়ই খারাপ খবর । ' কৌশিকী এবার সুমিতের কাঁধে ওর মাথাটা রাখল । কতদিন পর এই কাঁধে মাথা রাখল। ইচ্ছা হল ওর সুমিতকে একটা চুমু দেয়।
সুমিত ওর মনের ইচ্ছাটা বুঝতে পারল কিনা কে জানে ! কৌশিকীকে হঠাৎ করে একেবারে জড়িয়ে ধরে ওর ডান থুতনির কাছটায় ওর ঠোঁট নামিয়ে আনল। কৌশিকীর সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠল। সেই জায়গায় ! আবার ! কৌশিকীর চোখদুটো বন্ধ হয়ে গেল। সুমিত কিন্তু সেদিনকার মত আলতো করে একটা চুমু দিয়েই ছেড়ে দিল না। অনেকক্ষণ ধরে কৌশিকীর গালে একটা গভীর চুমু দিয়ে তবেই মুখটা তুলল ।
কৌশিকীর মুখটা লাল হয়ে গেছে । লজ্জায় না আনন্দে বুঝতে পারল না সুমিত। কৌশিকী একটু আনন্দে ছটফটিয়ে বলে উঠল,'তোমার মনে আছে দেখছি !'
সুমিত দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল ,'তা আর থাকবে না ! এখনো তো সেই প্রথম দিনের মতোই ছটফট করে উঠলে । ৪৪ এও এত রোমান্স।'
কৌশিকী লজ্জার হাসি হাসল । কিছু বলল না ।
সুমিত আবার বলল ,'তবে আমার একটা আর্জি আছে ।'
'বলুন জাঁহাপনা।'
'বিয়ের পর তুমি আমার ঘর আলো করে থাকবে আমার সঙ্গে। আমাকে তোমার গান শোনাবে কাজের ফাঁকে ফাঁকে আর আমাদের সঙ্গেই সুমন থাকবে আমার ছেলের মত হয়ে। আমার বড় ফ্ল‍্যাটটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে আমার ।' এই সময় আবার হঠাৎ বৃষ্টি নামল বেশ জোরে। সুমিতের চশমা তখন ভিজছে। কৌশিকী ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ভিজে চশমায় । সুমিত ওর চোখ থেকে চশমাটা খুলল। কৌশিকীর চোখ থেকেও ওর চশমাটা খুলে রাখল সুমিত। ভিজছে আবার দুজনে একসঙ্গে । সুমিতের ভেজা কোট আর কৌশিকীর ভেজা স‍্যুট আরো ভিজছে।
কৌশিকীর আনন্দে প্রায় চোখে জল এসে গেছে ততক্ষণে । অস্ফূটে বলল,'সুমন । এই দিনটার জন‍্যই আজ উনিশ বছর কত অপেক্ষা করে বসে আছি। '
সুমিতের হঠাৎ কি মনে হল। কৌশিকীর ঠোঁটের উপর ঠোঁট নামিয়ে আনল। কৌশিকী একই সঙ্গে আনন্দে,লজ্জায়,আবেগে চমকে উঠল। একটু ছটফট করে উঠল । সুমিত কিন্তু ছাড়ল না । কৌশিকীর ঠোঁটে গভীর চুমু দিয়ে যেতে থাকল ।
কৌশিকী বাঁধা দিতে গিয়েও দিল না। এই উনিশ বছরে কত চাওয়া পাওয়া, কত মান অভিমান,কত ভালোবাসা জমে রয়েছে দুজনের কাছেই। মানুষটাও রয়ে গেছে সেই তো তার মনের কাছেই । তারও তো কত কিছু না পাওয়া না দেওয়া রয়ে গেছে। এভাবে খুব সামান‍্য যদি কিছু দেওয়া নেওয়া হয়ে যায় তো অসুবিধা কি ! আর দুজনেই তো দুজনের । সেই কবে থেকে ! ভালোবেসে এত অপেক্ষা করেছে মানুষটা। এটুকু তো ওদের দুজনেরই প্রাপ‍্য। সুমিত ওর ঠোঁট দিয়ে যেন কৌশিকীর ঠোঁট থেকে কৌশিকীর এই এত বছরের সব কষ্ট,মান-অভিমান,যন্ত্রণা সব শুষে নিচ্ছে আর ঢেলে দিচ্ছে ভালোবাসা, প্রেম, মমতা, ধন‍্যবাদ আর অনেকটা কৃতজ্ঞতা। কৌশিকীও সুমিতকে ভালোবাসা,কৃতজ্ঞতা ফিরিয়ে দিয়ে সুমিতের সব অভিমান,অপেক্ষা সব নিয়ে নিতে থাকল ।
সুমিত এবার মুখ তুলে তাকাল কৌশিকীর চোখের দিকে । কৌশিকী সুমিতের বুকে মাথা রেখে সুমিতের মুখের দিকে তাকাল ।
সুমিত বলল,'কৌশিকী! আমি এখনই তোমার সঙ্গে তোমার বাড়ি যাব । সুমনকে ওর বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে তো ?'
কৌশিকী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সুমিতের দিকে। বলতে যাচ্ছিল ,'ও খুব খুশি হবে।' কিন্তু পারল না। তার আগেই সুমিত ফের লম্বা একটা চুমু দিয়ে কৌশিকীর মুখ বন্ধ করে দিল । কৌশিকী ওই অবস্থাতেই সুমিতের কাঁধে নিজেকে এলিয়ে দিল ।

বৃষ্টিভেজা গন্ধের স্বাদটা ওদের দুজনের কাছেই তখন বেশ মিষ্টি মিষ্টি লাগছিল । বৃষ্টিভেজা গন্ধের স্বাদ কি মিষ্টি হয় ! বোধহয় সুমিত আর কৌশিকী দুজনের কাছেই তখন বৃষ্টিভেজা গন্ধের স্বাদ মিষ্টি ! ভীষণ মিষ্টি !

সমাপ্ত

© FB.com/bikash.chakrabarty.92



Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn Pinterest StumbleUpon Email



~~ জলছবি ~~