Rojonigondha - A bengali story

Jolchobi

রজনীগন্ধা

শ্যামল মজুমদার

"তোর নাম কি?"
মেয়েটি ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকলো, অসহিষ্ণু হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,"কি রে নাম বলতে পারছিস না?"
মা তুলসী তলায় গোবর জল দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে বললো,"ওর নাম বুধি। চরন হাঁসদার মেয়ে।"
আমি ব্রাশ করতে করতে হঠাৎ লক্ষ করি একটা পনের ষোল বছরের কালো রংঙের মেয়ে সটান বাড়ির গেট খুলে ভিতরে এসে, দুটো বালতি নিয়ে পুকুর থেকে জল এনে ফুল গাছ গুলোতে দিচ্ছে। একটু অবাক হলাম, কোন মেয়ে কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে গেট খুলে ভিতরে ঢুকে আসে! গেট বলতে বাঁশের তৈরি বেড়া তার সাথে আড়াআড়ি ভাবে লতা গাছ লাগানো। মায়ের চিরদিনই ঠাকুর দেবতা ভক্তি, প্রতিদিন ঘন্টা খানেক কাটে ঠাকুর ঘরে তাই ফুলের প্রয়োজন খুব, ছোট থেকেই দেখি মা মরসুমি ফুলের গাছ লাগায় সামনের উঠোনে। আমার অবশ্য এত দেব দেবীর ভক্তি নেই কিন্তু ফুল খুব ভালোবাসি। তাই বাড়ি তে ফাঁকা থাকলে প্রতি বছর বর্ষা কালে নার্সারী থেকে বিদেশী কিছু ফুলের চারা লাগিয়ে দেই। তারপর, শীতের দিনে দেশি গাঁদা-জবা ফুলের সাথে যখন বিদেশী ডালিয়া -ক্যামেলিয়া ফোটে তখন অপরূপ লাগে।
যাইহোক আমি ব্রাশ শেষ করে হাতমুখ ধুয়ে এসে বসতে মা গরম গরম তেলেভাজা আর মুড়ি দিল। আমি তেলে ভাজা খুব ভালোবাসি কিন্তু কলকাতার ব্যস্ত জীবনে তেলেভাজা মুড়ি খেতেই পাওয়া যায়না। তাই বাড়ি আসলে প্রতি মাসে যে কয়েকদিন থাকি মা আমার জন্য আমার পছন্দের খাবার রান্না করে। গরম বেগুনী আর মুড়ি খেতে খেতে হঠাৎ দেখি বুধি এসে একটু দূরে দাঁড়িয়েছে আর জুলু জুলু চোখে আমার খাবারের দিকে তাকিয়ে। বুঝতে পারলাম খিদে পেয়েছে তার, মা বললো হঠাৎ,"দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বসে পড়।"
অবাক করে দিয়ে মেঝেতে বসে পড়লো, আমি অবাক হয়ে বললাম,"মেঝে তে বসে আছিস কেন? চেয়ারে বস।"
মা বললো, "ও চেয়ারে বসতে পারবে না। খাবার নিয়ে পড়ে যাবে। মেঝেতে বসুক। সেদিন টেবিলে ভাত খেতে দিয়েছিলাম সব ফেলে দিয়েছিল।"
খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম,"তুই কিসে পড়িস ?"
বুধি গোগ্রাসে মুড়ি গুলো খাচ্ছিল, আমার কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।
-"কোন ক্লাসে পড়িস ?বলতে পারছিস না।"
কিছুক্ষন এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো,"মা বললো খাইতে দিবেক লাই ইস্কুলে গিয়ে কি হবে। তার চেয়ে ঘরের কাজ শিখেলে বিয়ার আগে।"
আমি চমকে উঠে বললাম,"আজ থেকে বিয়ে? কত বয়স তোর? আজ থেকে বিয়ে নয়। আমি তোর মা কে বলবো স্কুলে পাঠাতে।"
মা হেসে বললো,"সে হবে না রে খোকা!"
আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম "কেন?"
মা বললো,"স্কুলে মিড ডে মিলের দুপুরের খাবার দেবেনা তাই তাকে আর স্কুলে পাঠাবেনা ।"
-"ওরা কি শুধু মিড ডে মিলের খাবার খেতেই স্কুলে যায় ?"
-"কি করবে? কত গুগলি (পুকুরের ছোট শামুক ), পোকা মাকড় খেয়ে থাকবে? সপ্তাহে তিন চার দিন ভাত হয় ওদের।"

আমি তর্ক করে বললাম,"কেন এখন তো সরকার থেকে দু টাকা কেজি চাল দেয় । তবুও ওরা ওইসব অখাদ্য কুখাদ্য খাবে কেন ?"
-"শোন খোকা, কলকাতায় থেকে এইসব বুলি অনেকে আওড়ায়। সরকার চাল দেয় কিন্তু মাঝ রাস্তায় নেতারা খায়, যা টুকু অবশিষ্ট থাকে ওগুলো পোকা মাকড়ে খায়। কেনার মতো টাকাই নেই। যা দিন মজুরি খেটে আয় করে সবই সন্ধ্যা বেলা চুল্লুর (এক প্রকার দেশি মদ ) জন্য খরচ হয়ে যায়।"
আমাদের এই যুক্তি তর্ক কতটা বুঝছিল কে জানে, নভেম্বর এর শুরু, হালকা শীত পড়েছে, হঠাৎ লক্ষ করে দেখি খেতে খেতে বুধি বেশ কাঁপছে।
বললাম, তোর সোয়েটার নেই?
সে মাথা নাড়লো, মা বললো,"খোকা, আবার যখন আসবি কলকাতা থেকে একটা সোয়েটার নিয়ে আসবি তো বুধির জন্য।"

* * * * * * *

এই কদিনে বুধির সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে । আমি বাড়ি তে না থাকলে জামা কাপড় কেচে দেয়, বই পত্তর গুছিয়ে রাখে, আমার রুম টা দুবেলা নিয়ম করে পরিষ্কার করে। আমি যখন পড়তে বসি সে ঘরের এক কোনে চুপচাপ বসে থাকে। সেদিন একটা বই হাতে দিয়ে বললো,"এত্ত মোটা বই তুমি কবে পড়বেক দাদা বাবু?"
তারপর হঠাৎ বললো, দাদাবাবু আমাকে কুলকাতা লিয়ে যাবেক!
হেসে বললাম,"তুই কি করবি ওখানে গিয়ে?" -"তুমার সব কাজ করে দিবেক উখানে"
তারপর বললো-"শম্ভু বলেছে উখানে অনেক গাড়ি অনেক বাস আছে।"
-"অ্যাই শম্ভু টা আবার কে রে!" আমি অন্যমনস্ক ভাবে জিজ্ঞেস করলাম।
সে একটু থেমে মাথা নিচু করে বললো,"উর সাথে আমার বিয়া হবেক!"

চেয়ে দেখি মেয়েটা লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে, বেশ বৌ বৌ ভাব।
একটা হালকা সুগন্ধ আসছিল, আমি তার উৎসের সন্ধানে চারপাশ তাকিয়ে যখন কোন হদিশ পেলাম না তখন বুধি আমাকে জিজ্ঞেস করলো,"দাদা বাবু কিছু খুঁজছো?" আমি এদিক ওদিক চেয়ে বললাম,"একটা দারুন গন্ধ আসছে কোথা থেকে বলতে পারবি"
বুধি খিলখিল করে হেসে বললো,"হেইঠা তো আমার খোঁপা থেকে আসছেক। তুমি বুঝতে পারক লাই!"
একটু অবাক হলাম,"বললাম তোর খোঁপা?"
সে হেসে তার খোঁপা থেকে সাদা একটা ফুল খুলে দিল। তারপর বললো, হেইঠা গন্ধরাজ ফুল। খুব গন্ধ হয়। আমি, মুংলি খুব চুলে বাঁধি ।
হাতে ধরা ফুল টা নাকে নিয়ে দেখলাম মৃদু কিন্তু মিষ্টি একটা সুগন্ধ। আমি তাড়াতাড়ি বললাম,"একটা চারা এনে দিতে পারবি। সামনের বাগানে লাগাবো।"
সে বললো , "চারা কি হবেক দাদাবাবু! হেইঠা ডাল ভাংগি পুঁতে দিলে ওমনি হইবেক।"
সেইদিন বিকেলে তার বাড়ি থেকে একটা গন্ধরাজের শাখা এনে গাঁদা-ডালিয়া গাছের মাঝে পুঁতে জল সার দিয়ে দিল। দু তিন দিন পর লক্ষ করলাম, গাছের শাখা টা থেকে নতুন পাতার মুকুল বেরিয়েছে।

মা বললো,"জানিস খোকা, সকাল থেকে বুধি আসেনি। খোঁজ নিবি তো। আমি একা এত কাজ এই বয়সে আর করতে পারিনা। মেয়েটা থাকলে সারাদিন আমার অনেক কাজ করে দেয় ।"
আমি ভাবলাম হয়তো মাসের শেষে বেতন পায়নি তাই আসেনি।
মা কে বললাম,"তুমি গত মাসের বেতন দিয়েছিলে ?"
মা বললো,"সে তো মাস শেষ হওয়ার অনেক আগেই তার বাবা চরন এসে টাকা নিয়ে চলে গেছে।"

মনে খটকা লাগলো। যাইহোক পাড়ার মোড়ে এসে নিতাইদার দোকানে চা সিগারেট খেয়ে ঠিক করলাম একবার বুধি দের পাড়ার দিকে যেতে হবে। গ্রামের প্রায় শেষ প্রান্তে আদিবাসী পাড়া। কোল ভিল মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। প্রায় গোটা তিরিশেক পরিবার থাকে। দীর্ঘদিন এদিকে আসিনি। সেই ছোট বেলায় এদিকে মাঝে মধ্যে বিকেলে সাইকেল নিয়ে ঘুরতে আসতাম। তারপর বাবা মারা গেলেন আর আমি কিছুদিন পর উচ্চমাধ্যমিক পাস করে কলকাতা চলে গেলাম পড়াশোনা করতে, তারপর একদিন পড়াশোনা শেষ হলো কিন্তু আমি বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা গুলোতে প্রস্তুতি হওয়ার জন্য রাইসে ভর্তি হলাম। আর ফ্রি সময়ে কয়েকটা টিউশনি করি। সেখানেই পরিচয় সহেলীর সাথে-আমার প্রেমিকা। অনেকটা তার টানেই বাড়ি আসা সম্ভব হয়না। মা কে বলেছি সহেলীর কথা। মা বলে,"তুই সুখী হলেই আমি সুখী।"আপাতত তাই চলেছে। গ্রামে আমাদের অনেক জমি জায়গা আছে। ভূপেন কাকুই চাষবাস দেখা শোনা করে সেই বাবার আমল থেকে। মায়ের সারাদিন ঠাকুর ঘর, কয়েকটা ধর্মগ্রন্থ আর সন্ধ্যাবেলা সিরিয়াল দেখেই দিন কাটে। এইসব ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে চলছিলাম, হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন ডাকছে দাদাবাবু বলে।
পিছন ফিরে দেখি একটা ঢিবির উপর বসে আছে বুধি। আমি বললাম,"কি রে এখানে এই সন্ধ্যাবেলা কি করছিস?"
সে সামনের ছাগল গুলো কে দেখিয়ে বললো,"হুই উদের কে চরাতে লিয়ে এসেছি।"
আমি কাছে গিয়ে বললাম,"সকাল থেকে যাস নি কেন? মা কত খোঁজ করছে!"
বুধি মাথা নিচু করে বললো,"ঘরে ঝামেলা হইচে।"
-"কিসের ঝামেলা।"
কয়েক সেকেন্ড থেমে বুধি বললো,"মা ঠিক কোরে রেখেছিল শম্ভুর সাথে আমার বিয়া দিবেক। কিন্তু বাপ মঙ্গলের কাছে অনেক টাকা ধার করসে। মন্গল বলচে তার সাথে আমার বিয়া দিতে নাহলে সব টাকা ফেরত দিতে। আজ মঙ্গলের অনেক লোক আসি শম্ভু কে মারছে।"

মঙ্গল কে আমি চিনি। চোলাই মদের ব্যবসা করে সাঁওতাল পাড়ায়। ওদের পাড়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। পুরো পাড়া তার কাছে চোলাই খেয়ে পড়ে থাকে। পঞ্চায়েতের লোকেদের সাথে তার খুব ভাব।
ব্যাপারটা আঁচ করে বললুম,"ঠিক আছে, তোর মায়ের সাথে আমি দেখা করে কথা বলে নেব, তুই কাল সকালে আসিস আমাদের বাড়ি। "
সন্ধ্যা হয়ে গেছিল, তাই সেদিন আর ওদের পাড়ায় না গিয়ে ফিরে আসলাম, ভাবলাম পরের দিন সকালে গিয়ে তার মায়ের সাথে দেখা করবো সময় করে।

* * * * * * *

সকালে বসে ফোন টা নিয়ে ফেসবুক করছি, বুধি এলো আমার ঘরে, দেখলাম তার কপালে একটু ফোলা দাগ। সকাল থেকে বেশ মেঘলা ওয়েদার, মাঝে মধ্যে টিপটিপ করে বৃষ্টি ফোঁটা ঝরছে।
জিজ্ঞেস করলাম, কিরে কপালে ওটা কিসের দাগ।
বুধি বললো,"কাল বাপ হাঁড়িয়া খেয়ে মাতাল হয়ে মা কে মারচে। মুই ছাড়াতে গেছিলি ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছি। উটার দাগ হেইঠা।"
-"সব্বোনাশ! তোর বাপ প্রতিদিন মাতলামি করে ঘরে?"
-"না মাঝে মাঝে ছিট ধরে যায় বাপের।"
খাটের নিচের টা পরিষ্কার করতে করতে বুধি বললো।
আমি ফোন ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ বললাম,"তোদের চুল্লু কি দিয়ে তৈরি হয় রে।"
বুধি হেসে বললো,"ও তুমি জানোনা! মহুল ফুল আর মহুল বিচি সেদ্ধ করে তার সাথে আরো কি সব দিয়ে হয়।"
আমি শুনেছিলাম মহুল গাছের ফুল দিয়ে মহুলিয়া বলে একরকম মাদক তৈরি হয়। মহুল গাছের ফুলে তীব্র নেশা হয়।
হঠাৎ কি মনে হলো বললাম,"মহুল গাছের ফুল এনে দিতে পারবি? তোর বাড়ি তে মহুল গাছ আছে?"
সে চোখ নাচিয়ে বললো,"তুমি খাবে তো দাদাবাবু!"
আমি বললাম,"সে একটা কাজে লাগবে, এনে দিবি মহুল ফুল?"

সেইদিন বিকালে চার পাঁচটা মহুল ফুল নিয়ে হাজির হলো বুধি। বেশ শীত শীত করছে নভেম্বর এর মাঝামাঝি, সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি হয়েই চলেছে। মা পাড়ার উমা কাকিমার বাড়ি গেছেন আড্ডা দিতে, আমি শুয়েছিলাম বিছানায়।
বুধি এসে বললো,"দাদাবাবু এনেছি তুমার লগে। "
সে বসেছিল একটা চেয়ারে , কিছুটা নিষিদ্ধ বস্তুর হাতছানি তে দুটো ফুল বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিলাম। কলকাতায় থাকলেও আজকাল আর ড্রিংক করা হয়না। আগে আমার বন্ধু অনিমেষ মাঝে মধ্যে আমাকে নিয়ে যেত বারে রবিবার গুলো তে, কিন্তু সে চাকরি পেয়ে দিল্লী চলে যাওয়ায় আর খাওয়া হয়না তেমন একটা। আর সহেলী মদ সহ্য করতে পারেনা তাই তার ভয়ে পুরোপুরি বন্ধ ওই জিনিস টা।
বুধি বললো," দাদাবাবু এইরকম খাইতে লাই। গরম জলে মিশাতে হবেক ।" আমি তার কথায় কান না দিয়ে চিবোতে থাকলাম। সে বসে বসে হরেক কিসিমের গল্প বলেই যাচ্ছে। শম্ভু তাকে বিয়ের পর রুপোর হার বানিয়ে দিবে, তার বোন মুংলি আজ থেকেই দু গ্লাস হাঁড়িয়া খায়। কিন্তু আমার সেদিকে নজর ছিলনা, ধীরে ধীরে অনুভব করছিলাম পায়ের তলার মাটি সরে গিয়ে মাথা টা বেশ বনবন করে ঘুরছে। আমি হাত বাড়িয়ে টেবিলে রাখা জলের গ্লাস টা কয়েক চুমুক খেয়ে আবার একটা ফুল খেয়ে নিলাম । বেশ মাথা টা বনবন করছে সামনে বসে বুধি, আমি উঠে গিয়ে সোজা বুধির সামনে দাঁড়ালাম। বেশ লম্বা কালো মেয়েটির সামনে, তার চিবুক ধরে দাঁড় করিয়ে চুমু খেলাম , কেঁপে উঠলো ষোড়শী মেয়েটি, কাঁপা গলায় বললো,"দাদাবাবু হেইঠা পাপ হবেক গো।" আমার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই, অতলান্ত শারীরিক আকর্ষনের তীব্র আবহে ঠোঁটের তীব্র নেশায় ডুবে গেলাম। আস্তে আস্তে আমার হাত তার চিবুক ছেড়ে গলা হয়ে নিচের দিকে নামতে লাগলো, প্রতিটা মুহূর্ত কে মনে হচ্ছে এক একটা যুগ, তাল পাতার মতো ক্ষনে ক্ষনে কেঁপে উঠছে বুধি।

হঠাৎ বাইরে মায়ের কাশির আওয়াজ, চমকে উঠলাম, বুধি কে ছেড়ে দিয়ে সরে আসলাম , সে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

* * * * * * * * * *
কলকাতায় থাকতেই মায়ের কাছে খবর পেয়েছিলাম বুধির বিয়ে হয়ে গেছে। তারপর কলকাতার ব্যস্ত জীবনে মিশে গেলাম নিবিড়ভাবে। ডিসেম্বরের ছুটি পড়লো, আবার বাড়ি গেলাম সাথে বুধির জন্য কেনা সোয়েটার টা নিয়ে কারন কলকাতা এসেই আমি ভুলে যাবো পরে এই ভেবে নিউ মার্কেট থেকে উলের সোয়েটার টা কিনে রেখেছিলাম। ভাবলাম! বিয়ে হলো তো কি হলো, একদিন ডেকে পাঠিয়ে তার হাতে সোয়েটার টা তুলে দিবো। ভারী খুশি হবে বুধি। হঠাৎ কয়েকদিন আগে বললো পুকুর গুলো এ বছর লিজ দিতে হবে নতুন কাউকে, তোর হারান কাকা আর পারছেনা এই বয়সে তুই বাড়ি আয়।

এদিকে ডিসেম্বরের ছুটি ও পড়তে যাচ্ছে তাই বাড়ি চলে এলাম। অনেক রাতে বাড়ি পৌঁছেছিলাম, তাই বাড়ি গিয়ে আর কোন কথা হয়নি সেভাবে মায়ের সাথে। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠোনে ফুল গাছগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে শীতের রোদ মাখছি, দেখি সব ফুল গাছে এ বছর প্রচুর ফুল ফুটেছে ।
মা কে বললাম,"মা এবছর অনেক বেশি ফুল হয়েছে অন্যান্য বছরের তুলনায়। "
মা একটু শুকনো মুখে বললো," যার হাতের ছোঁয়ায় এত সুন্দর বাগান টা সেজেছিল , সেই চলে গেল রে খোকা।"
আমি চমকে উঠলাম! মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে গেল,"কে চলে গেল মা ?"
মা বললো,"পরশু দিন বুধি গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারা গেছে! "
মুহূর্তে বুকের ভেতর টার অব্যক্ত যন্ত্রনা গুলো দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো, বিশ্বাসই হচ্ছে না কথা গুলো, আমি কি ভুল শুনলাম।
আমি হতচকিত হয়ে বলে উঠলাম,"কিন্তু তুমি তো বলেছিলে সেদিন ফোনে তার বিয়ে হয়ে গেছে।"
মায়ের গলা টা কেঁপে উঠলো, চিরদিনই একটু নরম মনের মানুষ, অজস্র বার দেখেছি সিনেমা সিরিয়ালের দুঃখের দৃশ্যে মা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
মা একটু থেমে বললো,"বিয়ে তো হয়েছিল শম্ভুর সাথে কয়েকদিন আগে। বাড়ি তে কেউ ছিলনা, শম্ভু লোকের বাড়ি কাজ করতে গেছিল তখনই সে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। পাড়ার কে একজন দেখেছে সেই সময় তার বাড়ি থেকে মঙ্গল কে বার হতে। সবাই জানে মঙ্গলই খুন করেছে তার সাথে বিয়ে না দিয়ে শম্ভুর সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য।"

কথা গুলো বলে মা থামলো। লক্ষ করলাম মায়ের দুচোখে জল এসে গেছে। মনে মনে এক সমুদ্র যন্ত্রনা দলা পাকিয়ে উঠল। কানে আসলো মা বলছে, "তুই কাল বাড়ি আসবি বলে তোকে আর বলিনি। মেয়েটা খুব সুন্দর ছিল রে বলে মা চলে গেল। "

কথা গুলো থামতেই দেখলাম মা চলে গেল ঘরের ভেতর। আমি তাকিয়ে ছিলাম গন্ধরাজ গাছটার দিকে। বেশ কুঁড়ি ধরেছে। ফুল ফুটবে আর কিছুদিন পর হয়তো। হয়তো পারতাম না বুধি কে কোনদিন তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে এই সভ্যসমাজের বুকে তবুও অনুভব করলাম অনেকটা জায়গা জুড়ে আমার বুকে রয়ে গেছে সে।
গন্ধরাজ ফুলের একটা কুঁড়ি তুলে হাতে ধরে মনে মনে বললাম, আবার ফিরে আয় বুধি, গন্ধরাজ ফুল হয়ে আবার ফিরে আয় আমার কাছে।

সমাপ্ত

© FB.com/shyamal.majumder.39501



Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn Pinterest StumbleUpon Email



~~ জলছবি ~~